তুখোড় লড়াকু পাখি খয়রা-হাঁড়িচাচা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
সৌন্দর্য ছড়িয়ে ডানা মেলেছে হাঁড়িচাচা যুগল। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

সৌন্দর্য ছড়িয়ে ডানা মেলেছে হাঁড়িচাচা যুগল। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

বুলবুলি ছোট পাখি বাসা। গাছের পাতার আড়ালে। তাতে তিনটি ছানা। তবে এখনো তাদের চোখ পৃথিবীর আলো দেখেনি। এমন সময় দু’টি হাঁড়িচাচা চিৎকার করতে করতে হঠাৎ আক্রমণ চালালো সেই বুলবুলির বাসার উপর। ছানাগুলোকে মুহূর্তে ধরে নিয়ে যায়।

নির্মম ঘটনা! তীব্র কষ্টে ভরা এই সত্য ঘটনাটি প্রকৃতির অনিবার্য নিয়ম। কারণ এটি প্রকৃতির এক প্রকারের জীবনচক্র। মেনে নিতেই হয় যে- প্রকৃতির সবাই কারো না কারো খাদ্য।

মানুষের মধ্যেই শুধু নয়। পাখিদের মধ্যেও রয়েছে হাইজ্যাকার! যারা জোরপূর্বক খাবার ছিনিয়ে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। কোনো কিছু বোঝে উঠার পূর্বে শুরু হয়ে যায় আক্রমণ। তারপর একপর্যায়ে খাবার ছিনিয়ে নেবার পুরো প্রক্রিয়াটি পায় সফলতা।

এমন হাইজ্যাকার বা ছিনতাইকারী ধরণের পাখির নাম খয়রা-হাঁড়িচাচা।

শিকারের সন্ধানে খয়রা-হাঁড়িচাচা। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

খুবই কর্কষ গলায় জোরে জোরে ডাকে। এই ডাক প্রতিধ্বনিত হয়ে কিছুটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। আমাদের দেশে ২ প্রজাতির হাঁড়িচাচা রয়েছে। এক প্রজাতির নাম খয়রা-হাঁড়িচাচা (Rufous Treepie বা Indian Treepie) এবং অপরটি মেটে-হাঁড়িচাচা (Grey Treepie)। প্রথমটি আমাদের দেশের সুলভ আবাসিক পাখি। অর্থাৎ সারাদেশেই পাওয়া যায়। আর দ্বিতীয়টি দুর্লভ আবাসিক পাখি। অর্থাৎ খুব কম দেখা মেলে। 

প্রখ্যাত বন্যপ্রাণি গবেষক ও লেখক শরীফ খান বলেন, হাঁড়িচাচা কাক গোত্রের পাখি। দেখতে অনেকটা পাতিকাকের মতো। এরা তুখোড় লড়াকু, দুঃসাহসী ও দক্ষ শিকারি। গ্রামাঞ্চলে এদেরকে ‌‌তেড়ে নামে চেনে। মজার ব্যাপার হচ্ছে– কোকিল সুযোগ পেলেই এদের বাসায় ডিম পাড়ে। আর এরা বোকার মত কোকিলছানাদের খাওয়ায় এবং লালন-পালন  করে।

গাছের উঁচু ডালে বসে দেখতে থাকে চারদিক। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

আঞ্চলিক নাম ও শিকার সম্পর্কে তিনি বলেন, তাল গাছের তাড়ি খায় বলে হাঁড়িচাচাকে আমাদের গ্রামাঞ্চলে ‘তাড়ে’ নামে ডাকা হয়। ঢাকাসহ সারাদেশেই তাদের দেখা যায়। কোনো কোনো ঈগল বা চিল সময় মাছ বা কোনো পাখি ছানা ধরে নিয়ে দু’টি হাঁড়িচাচা একত্রিত হয়ে সেই ঈগল বা চিলের ওপর হামলা চালায়।

পাখিটি আকার-আকৃতি ও শারীরিক বর্ণনায় তিনি বলেন, হাঁড়িচাচার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ সেমি এবং ওজন প্রায় ১১৫ গ্রাম। বড় লেজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ সেমি। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। এদের শরীর অনেকটা জলপাই বাদামি। লেজের আগার দিক কালো এবং লেজের উপরিভাগ ছাই-ধূসর। ডানার উপরিভাগটা সাদাটে ছাইরঙা। কালচে ধূসর গলা, মাথা ও ঘাড়। পিঠ বাদামি। বুক ও পেট হালকা হলুদ রঙা।

শরীফ খান আরো বলেন, ওদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে– ফল, ফুলের মধু, পোকা, অমেরুণ্ডী প্রাণী, ছোট সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, পাখির ছানা প্রভৃতি। ওরা যখন উড়ার জন্য ডানা মেলে তখন নিচ থেকে ওদের দেখতে দারুণ লাগে। শরীরের ছোট-বড় পালকগুলোর বিন্যাস অতি চমৎকারভাবে ধরা পড়ে তখন।