ঘষিয়াখালীর বাঁকে



জাকারিয়া মন্ডল
ঘষিয়াখালী চ্যানেলে ড্রেজিং। ছবি: শুভ্রনীল সাগর

ঘষিয়াখালী চ্যানেলে ড্রেজিং। ছবি: শুভ্রনীল সাগর

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘোলা জল ঠেলে এগুতে থাকে মধুমতির বিশাল বপু। তেলীখালীর উল্টোদিকে ঘষিয়াখালী নদী। বলেশ্বর থেকে বেরিয়েই এস আকৃতির বাঁক নিয়েছে। বাঁকের মাথায় পশ্চিমপাড়ে মোড়েলগঞ্জ নৌ টার্মিনাল।

যশোহর খুলনার ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ডে সতীশ চন্দ্র মিত্র বলছেন, মোরেল নামে এক ইংরেজ পত্নীর নামেই এই মোড়েলগঞ্জ নাম। ইংরেজ আমলে সুন্দরবনের সীমানা নির্ধারণ আইন হলে বন কেটে আবাদি জমি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সুন্দরবন ভাগ করে লিজ দিয়ে দেওয়া হয় জমিদারদের। বলেশ্বরের তীরের তালুক নেন মোরেল। তার পুত্ররা সুন্দরবন কেটে আবাদি জমি বের করেন। পাকা বাড়ি করেন। তার নামে নতুন বাজার হয়। নাম হয় মোড়েলগঞ্জ।

বাংলাপিডিয়ায় সেই ইংরেজ পত্নীর নাম পাওয়া যায় হেনরি মোরেল। আর জাতীয় তথ্য বাতায়নে, ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে এ জনপদ মোরেলগঞ্জ নাম পায়। বাগেরহাট জেলার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে ছোট কলকাতা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

 ঘষিয়াখালী চ্যানেল পাড়ে ঘর-গৃহস্থালি। ছবি: সংগৃহীত

এখানকার কুঠিবাড়ি এখনও ইংরেজ আমলের স্মৃতি বইছে। বাঁক খেয়ে খেয়ে উত্তরে এগিয়ে চলা ঘষিয়াখালী নদীটা চ্যানেল, আবার পানগুছি নদী নামেও পরিচিত।

এ চ্যানেলের উভয় মুখই বৃহত্তর নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। সুন্দরবনে এমন জলধারাকে বলা হয় দোয়ানিয়া খাল। জোয়ারের সময় এ খালের উভয় প্রান্ত থেকে ভেতরের দিকে পানি চাপ দেয়। ভেতরের দিকে মুখোমুখি দুই স্রোত মিলিত হয়। দীর্ঘ সময় স্রোতহীন হয়ে পড়া জলের নিচে থিতু হতে থাকে পলি।

ঘষিয়াখালী চ্যানেলের তলদেশ তাই প্রতিনিয়তই ভরাট হতে থাকে। জলপথ নাব্য রাখতে বছরভরই খনন চালাতে হয় ঘষিয়াখালীতে। এখনও নদীর বুক থেকে লম্বা পাইপে পলি তুলছে ড্রেজিং মেশিন।

ঘষিয়াখালীয় চ্যানেলের পশ্চিম তীরের একটি খান। ছবি: সংগৃহীত

দুপাড়ে ধানখেত, চিংড়ির ঘের, নিঃসঙ্গ ছাউনি। জাল ফেলে মাছ ধরার আয়োজন। বৈঠা বেয়ে শিশুদের আনন্দ। এই খালের সঙ্গেই জীবন বাঁধা ওদের। প্রকৃতির সঙ্গে যুঝতে যুঝতেই বেড়ে ওঠে।

রামপাল পেরিয়ে পশ্চিম-দক্ষিণে বাঁক নিয়েছে ঘষিয়াখালী। সামনে পশুর নদী। বাটিয়াঘাটায় রূপসা থেকে বেরিয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে বঙ্গোসপাগরে পড়েছে।

ঘষিয়াখালী চ্যানেল। ছবি: শুভ্রনীল সাগর

পশুর এক সময় সম্পূর্ণরূপে কেবল সুন্দরবনেরই জলধারা ছিল। এর সঙ্গে কোনো পার্বত্য জলের সংযোগ ছিল না। সাগরের জোয়ার ভাটা খেলত কেবল। সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর খুলনার ইতিহাস প্রথম খণ্ডে বলা হচ্ছে, ‘পশর তখন খুলনার পূর্ব দিকে বিল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিল পাবলা হইতে শ্মশান ঘাটের খাল নামে এক ক্ষুদ্র নদী খুলনার দক্ষিণে মৈয়ার গাঙে মিশিয়াছিল। এই মৈয়ার গাঙ কাঁচিপাতা নামক প্রবল শাখা দিয়া ঘুরিয়া পশরে পড়িয়াছিল। শ্রীরামপুরের পূর্ব-পুরুষ রাম নারায়ণ ঘোষ নিজ নামে নারায়ণ খালি খাল কাটিয়া কাঁচিপাতার সহিত পশরের সোজা সংযোগ করিয়া দেন। সেই সংযোগ স্থান হইতে ভৈরব নদ মাত্র তিন মাইল দূরবর্তী ছিল। রূপ সাহা নামে এক ব্যক্তি (লবণ ব্যবসায়ী) একটি ক্ষুদ্র পয়ঃপ্রণালী কাটিয়া ভৈরবের সহিত কাঁচিপাতার সংযোগ সাধন করেন। সেই ক্ষুদ্র খাল অচিরে ভীষণ মূর্তি পরিগ্রহ করিল। ভৈরবের জল পথ পাইয়া ভীষণ বেগে ক্ষুদ্র খালকে নদী করিয়া দিল। ইহাই আজকের পশর।’

এ নদীতে ঘষিয়াখালীর মিলনমুখের কাছে মোংলা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর। মঙ্গল রাজার নামানুসারে গ্রিক জাহাজের ক্যাপ্টেন মোংলা নামকরণ করেন বলে কথিত আছে।

ঘষিয়াখালী চ্যানেলে জীবন সংগ্রামি শিশু। ছবি: শুভ্রনীল সাগর

একসময়, এই জলপ্রবাহের উজানে বর্তমানের খুলনা শহর পর্যন্ত ছিল সুন্দরবনের বিস্তৃতি। বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর খুলনায় বলা হচ্ছে, সুন্দরবনের উত্তর প্রান্তের ওই স্থানে নৌকা নোঙর করত কাঠুরেরা। এক রাতে ভীষণ ঝড় হল। নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য নৌকার নোঙর খুলতে গেল মাঝিরা। তখন বনের ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে এলো- খুলো না, খুলো না। সম্ভবত সে কারণেই খুলনা নামের উৎপত্তি।

যশোহর খুলনার ইতিহাস প্রথম খণ্ডে বলা হয়েছে, মহাভারতের যুগে পুণ্ড্রাধিপতি বাসুদেব তার বৈমাত্রের ভ্রাতাকে বিতাড়িত করেন। বিতাড়িত ভ্রাতা মুনি ব্রত নিয়ে সুন্দরবনের মধ্যে এক আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। কপোতাক্ষ নদীর তীরে ওই স্থান এখন কপিলমুনি নামে খ্যাত।

কিন্তু পশুরের উজানে এখন আর কোনো বনের চিহ্ন নেই। উজাড় হতে হতে মোংলার দক্ষিণে সরে গেছে সুন্দরবন। আর বাঁধ তুলে মোংলা শহরকে বাঁচানো হয়েছে প্লাবনের পানি থেকে।

জাকারিয়া মন্ডল, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক