দৈনিক ২শ’ গ্রাম খাদ্যসংকটে খয়রা-মেছোপ্যাঁচা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
জলাভূমি সংলগ্ন বনে চুপ করে বসে থাকে খয়রা-মেছোপ্যাঁচা। ছবি: ইনাম আল হক

জলাভূমি সংলগ্ন বনে চুপ করে বসে থাকে খয়রা-মেছোপ্যাঁচা। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

সন্ধ্যা হলেই অশ্বত্থ-বটসহ বিশালাকৃতির গাছ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে হুউম...হুউম...হুউম করে ডাক দিয়ে উঠতো। কিন্তু এখন তো আর সেইসব বিশালাকৃতির গাছই নেই। সব কাটা গেছে যাচ্ছে! একটা ডাক শেষ হবার সাথে অন্যজনের ডাক শুরু! ওগুলো আসলে খয়রা-মেছোপ্যাঁচা। এদের ইংরেজি নাম Brown Fish Owl এবং বৈজ্ঞানিক নাম Ketupa zeylonensis।

তবে অনেক অঞ্চলে এদেরকে ভূতূমপ্যাঁচা নামে ডাকা হয়ে থাকে। এরা নিশিচর শিকারি পাখি। এরা বড় গাছের আড়ালে বা ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকে। বিল-জলাশয়ের বড় গাছে এরা বাসা বাঁধে। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬ সেমি এবং ওজন প্রায় ১.১ কেজি। 

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং পাখি বিষয়ক প্রখ্যাত লেখক-গবেষক ইনাম আল হক বলেন, ‘খয়রা-মেছোপ্যাঁচা বড় আকারের পাখি। মানে ওর বড় খাবার চাই। তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং প্রজননের জন্য অন্তত তার দৈনিক ২০০ গ্রাম মাছ প্রয়োজন। তবে ১০০ গ্রামের মাছেও তার হয়তো হবে। কিন্তু তখন তার পুষ্টি হবে। প্রজনন হবে না। ওই প্রয়োজনীয় ২০০ গ্রামের দৈনিক খাবারটুকু ওরা এখন আর পাচ্ছে না। ফলে অচিরেই এরা বিপন্ন হয়ে পড়বে বাংলাদেশ থেকে।’

তীব্র খাদ্যসংকটে খয়রা-মেছোপ্যাঁচাদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। ছবি: ইনাম আল হক


 

‘তবে যদিও এরা এখনো বিপন্নর তালিকায় উঠেনি। কিন্তু অনায়াশে বলা যায় কিছু দিনেই মধ্যেই বিপন্নর তালিকায় ঠাঁই হবে ওদের। কারণ – মাছ কোথায়? ওরা যে মাছ ধরে খায় – আমাদের হাওর-বিল-জলাশয়ে এতো মাছ কী আছে এখন?’

তিনি আরো জানান – ‘আগে এতো মাছ ছিল যে, সে বিল-জলাশয়ের ধারে বসলেই একটা/দুটো মাছ পেত। এখন তাও আর পায় না। প্যাঁচারা তো মানুষের মতো জাল ফেলে ছেকে মাছ ধরতে পারে না। আমরা মাছ ধরতে ধরতে সব মাছ শেষ করে ফেলেছি। আমরাই এখন আমাদের প্রয়োজনীয় মাছটুকু পাই না। আর প্যাঁচাদের তো মাছ পাবার প্রশ্নই আসে না।’

মনে করেন– একটি পুকুরে দুইটি মাছ থাকলে সেই মানুষের মতো ওই দুইটি দুইটি মাছ ধরতে পারবে না। ওই পুকুরে যদি দুই হাজার মাছ থাকে তাহলে সে হয়তো দু-একটি মাছ অনায়াসে পেতে পারতো।

মাছের সন্ধানেই থাকে খয়রা-মেছোপ্যাঁচা। ছবি: ইনাম আল হক


 

গভীর সমস্যার কথা উল্লেখ করে ইনাম আল হক বলেন, ‘সমস্যাটা হচ্ছে ওখানেই যে, আমাদের খাবার আর মেছোপ্যাঁচার খাবার একই। অর্থাৎ মাছ। অন্য প্যাঁচাদের এই সমস্যা নেই। যেমন ধরেন শিকড়ে প্যাঁচার (Brown Hawk Owl) কথা। সে ঝিঁঝিঁ পোকা খায়। আমরা ঝিঁঝিঁ পোকা খাই না। ফলে ওরা বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। এবার মনে করেন, লক্ষ্মীপ্যাঁচার (Barn Owl) কথা। ওরা ইঁদুর খায়। আমরা ইঁদুর খাই না। ফলে লক্ষ্মীপ্যাঁচারও ভালোই আছে। কিন্তু সেহেতু মেছোপ্যাঁচা আর আমাদের খাবার একই সেজন্য তাদের দুর্দিন এসে গেছে। কারণ আমরা তো ওর সব খাবার খেয়ে ফেলছি।’

খয়রা-মেছোপ্যাঁচা দুর্লভ আবাসিক পাখি। সব জায়গায় তাকে দেখা যায় না। কিন্তু এখন সারা বাংলাদেশ ঘুরলেও চার/পাঁচটাকে পাবেন না। আমরা অনায়াসে মেছোপ্যাঁচাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছি বলে জানান প্রখ্যাত গবেষক ইনাম আল হক।