করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ব্যাংকের লেনদেন



মো: মোসলেহ উদ্দিন, অতিথি লেখক
ব্যাংকের লেনদেন। ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংকের লেনদেন। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাকালে নাগরিক চলাচল সীমিতকরণ কিংবা গৃহবন্দিত্বের প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার আরোপ করা হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে টাকার প্রয়োজন থাকছেই। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র কেউই এ বাস্তবতার বাইরে নয়। ফলে করোনাকালের সাধারণ ছুটি আর লকডাউনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অপরাপর অফিস আদালত বন্ধ থাকলেও টাকার লেনদেনের জন্য ব্যাংক খোলা ছিল।

লেনদেনের কম সময় বেঁধে দেয়া কিংবা জনশক্তির রোস্টারিংয়ের শর্ত দিয়ে হলেও ব্যাংক খোলা রাখতে হয়েছে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কারণে। কারণ সুস্থ/স্বাভাবিক কিংবা অসুস্থ/অস্বাভাবিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, জীবন ধারণের জন্য টাকা চাইই। বরং একটি অনিশ্চিত এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে টাকার প্রয়োজন আরো বেশি অনুভূত হয়।

বিগত দিনগুলোতে যে চিত্র ব্যাংক পাড়ায় দেখা গেছে তার আলোকে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার পর আরেকটি ভয়াবহ অস্বাভাবিকতার অবস্থার কথা ব্যাংকারমাত্রই কল্পনা করতে পারে। বিশেষ করে গ্রাহকবহুল ব্যাংকগুলোর জন্য তো ব্যাপারটিকে রীতিমত আত্মঘাতমূলক বলেই উল্লেখ করা যায়। ব্যাপার তো এমন যে, টাকার জন্য জীবনের ঝুঁকিও তুচ্ছ কারো কারো কাছে।

অবাক করা বিষয় ছিলো এমনও যে, সেসময় জরুরি প্রয়োজনের টাকা যেমন অনেকে উঠিয়েছেন তেমনি অনেকে ঘরের কিংবা হাতের টাকা ভিড় ঠেলে ব্যাংকে এসে জমা দিতেও যারপরনাই মরিয়া ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ ছিলো ব্যাংকের ভেতর সামাজিক দূরত্ব মানা যায় শুধুমাত্র এমনসংখ্যক লোকই একসাথে ব্যাংকে ঢুকাতে। সেবা গ্রহণ করে আগের দল থেকে যে পরিমাণ বের হবে শুধু সে পরিমাণ লোককেই আবার প্রবেশ করতে দেয়া। তবে ব্যাংকগুলোর জন্য সে চেষ্টা ছিলো নিরেট পণ্ডশ্রমের মতো। আটকালে গেটের সামনে ভিড়। আর ছেড়ে দিলে ব্যাংকের ভেতরে ভিড়। তারপরও প্রবেশ করা এবং বের হবার সময় যে ধাক্কাকাধাক্কি তাকে তো করোনা স্বাস্থ্যবিধির কোনো অভিধায় ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। নিয়ন্ত্রণ চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতে মরিয়া মনোভাবের কাছে ব্যাংকারদের হার মানা ছাড়া উপায়ও ছিল না তখন।

সারা দুনিয়া জুড়ে এমনই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সময়ে আমাদের খামখেয়ালিপনার মাঝেও কপাল গুণে হয়তো আমরা বেঁচে গেছি। আমাদের পূণ্যের পাল্লা ততোটা ভারি না হলেও আল্লাহ রহমতে সে যাত্রায় বেঁচে যাওয়া মানে একেবারে মুক্তি নয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন সে জায়গায় নিজেকে একবার ভাবলে অনুমান করা যায় আসল বাস্তবতা। আবার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে কিংবা নিজ ঘরে বিছনায় কাতরাতে কাতরাতে বেঁচে গেছেন তাদের কাছেও গা শিউরে ওঠা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার গল্প শুনেও যারা আক্রান্ত হনননি তারা কতটা ভাগ্যবান তাও অনুমান করতে পারেন।

আসছে শীতে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মহল। সরকারও সজাগ। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে দেশময় নানা কঠোরতা আরোপের আভাস মিলছে গণমাধ্যমের বরাতে। ইতোমধ্যে ”নো মাস্ক নো সার্ভিস” নামে একটি শ্লোগান সরকারী তরফে প্রচারও করা হচ্ছে।

সম্ভাব্য কঠিন সময়ে অফিস আদালত খোলা রেখেই হোক কিংবা কার্যক্রম সীমিত করেই হোক সকল ক্ষেত্রে সফলতার জন্য চাই নাগরিক সচেতনতা। ”আমাদের কিছু হবে না” ধাঁচের বালখিল্য কথাবার্তায় প্রভাবিত আচরণ আর যাই বিবেকসিদ্ধ যে নয় তাতে সচেতন মানুষমাত্রই একমত হবেন।

সামনের পরিস্থিতি যাই হোক, ব্যাংক কিন্তু চলবেই। তবে গ্রাহকগণ সচেতন হলে নিম্নোক্ত বিকল্প পদ্ধতির ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করে নিজেকে এবং অন্যকে নিরাপদ রাখতে পারেন।

এক) এজেন্ট ব্যাংকিং: গ্রামাঞ্চলের বাজার/হাটে বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকের এজেন্ট শাখা রয়েছে। এসব এজেন্ট শাখায় সীমিত পরিসরে প্রায় শতভাগ নিরাপদ সকল প্রকার ব্যাংকিং সেবাই পাওয়া যায়। গ্রামের মানুষদের উচিৎ সেখান থেকেই নিজ নিজ এলাকায় এজেন্ট কেন্দ্র হতে সেবা গ্রহণে অভ্যস্ত হওয়া। যাতে শুধুমাত্র ব্যাংকিং সেবার জন্য তাদের শহরমুখী হয়ে করোনার ঝুঁকির মুখে না পড়তে হয়।

দুই) ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা: প্রায় সকল ব্যাংক এখন ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে। এসব ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যাংকিং সেবার বৈশিষ্ট্য হলো গ্রাহক ব্যাংকে না গিয়েও ব্যাংকিং সেবা পেতে পারেন। এসব সেবা আবার রিয়েল টাইমভিত্তিক। অর্থাৎ দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা এবং সপ্তাহের সাতদিনই এসব সেবা সুবিধা ভোগ করা যায়।

এসব সেবা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে অটোমেটেডে ট্রেইলার মেশিন বা এটিএম হলো রিয়েলটাইম পেমেন্ট ক্যাশিয়ার। যা ব্যাংক একাউন্ট হতে চেকের মাধ্যমে টাকা উঠানোর বিকল্প এবং সুবিধাজনক পদ্ধতি। এটিএম/ভিসা নামীয় কার্ড দিয়ে এটিএম হতে টাকা উঠানো অতি সহজ হলেও এখানো দেশের সিংহভাগ গ্রাহক ব্যাংকে স্বশরীরে গিয়ে টাকা উঠাতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন । তাদের এ মানসিকতা পাল্টাতে হবে। করেনাসময়ে ব্যাংকের গিয়ে নিজে ভিড়ে পড়া কিংবা ভিড়ের কারণ হওয়া এড়াতে চাইলে এটিএম বুথ ব্যবহারের বিকল্প নেই।

এটিএম এ টাকা উত্তোলনের কাজটা চললেও জমার কাজে তো ব্যাংকে যেতে হয়। তার মানে ঝুঁকি তো থাকছেই। তবে এর বিকল্প হিসেবে ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন বা সিআরএম মোক্ষম ব্যবস্থা হিসেবে সংযুক্ত হয়েছে। একই মেশিনে টাকা জমা এবং উঠানোর ব্যবস্থা আছে। উন্নত প্রযুক্তির এসব মেশিন স্বয়ংক্রিংয়ভাবে টাকা গণনা, বাছাই করে গ্রাহকের চাহিত একাউন্টে তাৎক্ষণিক টাকা জমা করে প্রিন্টেট রিসিপ্ট প্রদান করে এবং মোবাইল ম্যাসেজের মাধ্যমে জমা নিশ্চিত করে।

একজনের জমাকৃত টাকা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় গুছানো হয়ে মান অনুযায়ী আলাদা আলাদা ট্রেতে চলে যায় এটিএম পেমেন্টের জন্য। এটিএম/ভিসা কার্ড দিয়ে একই টাকা থেকে অন্য গ্রাহক উঠাতে পারেন। ফলে একই সাথে সিআরিএম রিসিভ এবং পেমেন্ট ক্যাশিয়ারের দ্বৈত ভূমিকায় কাজ করে। এতে করে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তাতে অস্বাভাবিক সময়ে তো বটেই স্বাভাবিক সময়েও পথের পাশের এসব মেশিন ব্যবহার করে অধিকাংশ গ্রাহক লেনদেনের প্রয়োজন সারতে পারবেন।

তবে অসুবিধার একটা দিক এই যে, বাংলাদেশে সিআরএম এর ব্যবহার খুবই সাম্প্রতিক এবং এখন পর্যন্ত বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ। আশার কথা হলো চলতি বছর হতে তা ক্রমে জেলা এবং উপজেলা শহরেও পৌঁছে যাচ্ছে। এজেন্টের বৃহৎ নেটওয়ার্কের পাশাপাশি গ্রামে গঞ্জের প্রায় প্রতিটি বড় হাট/বাজার ছাড়াও রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/শিল্প প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল সেবার সেরা নেটওয়ার্ক। একটু সচেতন এবং হিসেবি হলে অনেক গ্রাহককেই আর সেবার জন্য ব্যাংকে যাবার প্রয়োজন হবে না। আর এভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের প্রেক্ষাপটে করোনার শীতকালীন সম্ভাব্য দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকিও ম্যানেজ করা সম্ভব হবে ইন শা আল্লাহ।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও ব্যাংকার