করোনাকালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ও উত্তরণের সুপারিশ



ড. প্রণব কুমার পান্ডে
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কোভিড-১৯ মহামারি সারা বিশ্বে শিক্ষা খাতকে নেতিবাচক ভাবে প্রভাহিত করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জুনিয়র স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা স্তরের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন অচল হয়ে পড়েছে। উন্নত দেশগুলোতে এই পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন কারণ যেখানে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষাব্যবস্থা অনলাইনে রূপান্তরিত হয়েছে। তারা এই মারাত্মক ভাইরাস সৃষ্ট ‘‘নিউ নর্মাল’’ জীবন যাত্রার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারছে কারণ তাদের রয়েছে শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো। ফলে শিক্ষার্থীরা এর সুফল পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবার উদ্বিগ্নতা নিয়ে সময় পার করছে।

ইউজিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন ‘‘নিউ নর্মাল’’ জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারে এবং শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার সম্ভাব্য কৌশল নির্ধারণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। বিভিন্ন কৌশলগুলোর মধ্যে একটি কৌশল হল সমস্ত বেসরকারি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ক্লাস চালু করা। ফলে, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চলছে। ইউজিসি শিক্ষার্থীদের কম দামের ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের জন্য বিভিন্ন মোবাইল অপেরাটরদের সাথে চুক্তিতে পৌঁছেছে। ইউজিসির এই গঠনমূলক পদক্ষেপ অভূতপূর্ব সংকট কাটিয়ে উঠতে সকলকে সাহায্য করবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটু সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে কারণ তারা অনলাইনে ক্লাস করার পাশাপাশি এবং অনলাইনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ডিগ্রি অর্জন করছে। ফলে, মহামারি কালীন সময়ে তাদের শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হচ্ছে না। তবে, করোনাকালীন সময়ে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলের অভাবে তাদের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সময় মতো পরিশোধ করতে পারছে না। অনলাইন পরীক্ষার ভিত্তিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা রয়েছে। ইউজিসি কোভিড-১৯-এর প্রাথমিক পর্যায়ে অনলাইন পরীক্ষায় বিধিনিষেধ আরোপ করলেও পরবর্তীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির অনুরোধের প্রেক্ষিতে তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। মহামারির মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি নিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করেছে, কারণ তাদের একাডেমিক জীবন অচল হয়ে পরলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন শেষে কর্ম জীবন শুরু করতে পারছে। ফলে, চাকরির বাজার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা দখল করে নিবে এই ভেবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে ভুগছে। তবে এই বিষয়ের পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সুড়ঙ্গের শেষে কোনও আলো দেখতে পাচ্ছে না কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসি তাদের পরীক্ষার বিষয়ে এখনও কোনও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়নি। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, বাস্তবতা হলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও গত কয়েক মাস ধরে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, শিক্ষার্থীরা হয় তাদের পাঠ্যক্রমটি শেষ করে ফেলেছে বা সমাপ্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে, এবং তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছে। দুর্ভাগ্যক্রমে, তারা অনলাইনে পরীক্ষায় বসতে পারছে না কারণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন শিক্ষার্থীদের অনলাইন পরীক্ষার ভিত্তিতে ডিগ্রি দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করে না। ফলে, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল যদি তাদের পরীক্ষা না হয় তবে একাডেমিক জীবন থেকে এক বছর হারাতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কী হবে? সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা তাদের জীবন থেকে দুটি সেমিস্টার হারাতে চলেছে বিধায় বাৎসরিক পদ্ধতির শিক্ষার্থীদের তুলনায় সেমিস্টার পদ্ধতিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতির তীব্রতা আরও শোচনীয়। শীতকালে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আরও অবনতির হওয়ায় এই অচলাবস্থা কত দিন অব্যাহত থাকবে তা এই মুহূর্তে বলা খুব কঠিন।

ইতোমধ্যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের প্রোগ্রাম অফারিং সত্তাগুলোকে (পিওই) কে পূর্বের সেমিস্টারের পরীক্ষা না দিয়ে পরবর্তী সেমিস্টারের ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। এটি কোন যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত নয় কারণ এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের আরও হতাশাগ্রস্ত করবে। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে নতুন সেমিস্টারে ক্লাশে অংশ নেওয়ার সময় তারা আগের ক্লাসে যা শিখেছিল তা ভুলে যাবে। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে।

এ ছাড়াও কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে যা কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত ছিল। অনলাইন ক্লাস নেওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি যে একটি নির্দিষ্ট অংশের শিক্ষার্থীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অনলাইন ক্লাসে যোগ দেয় না। তাদের অনেকেরই ডিভাইস না থাকা, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিরবিচ্ছিন বিদ্যুতের সরবরাহে সমস্যা থাকতে পারে। পরের সেমিস্টারের ক্লাস আগের সেমিস্টারের পরীক্ষা ছাড়াই শুরু হলে এই শিক্ষার্থীদের কী হবে? সুতরাং, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের দু’বার চিন্তা করা উচিত। তাছাড়া, হল না খুলে কিছু কিছু বর্ষের পরীক্ষা নেওয়ার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয় হলেও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে কারণ হল না খুললে ছাত্রীরা কোথাও অবস্থান করবে? বাইরে অবস্থান করে পরীক্ষা দেওয়া তাদের জন্য ঝুঁকি হতে পারে।

এখন একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো আমাদের শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে এবং মহামারিজনিত ট্রমা কাটিয়ে উঠতে তাদের উৎসাহিত করার জন্য কী কাজ করা যেতে পারে? একটি সম্ভাব্য কৌশল হলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন পরীক্ষা নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এর জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে পরিবর্তন আনতে হতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি যে প্রায় সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিলেকশন কমিটি সভা, এমফিল এবং পিএইচডি ভাইভা পরীক্ষা এবং বছরের শেষের ভাইভা পরীক্ষা ভার্চুয়ালি পরিচালনা করার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। যদি এই পরীক্ষা এবং সভাগুলো ভার্চুয়ালি পরিচালনা করা যায় তবে অনলাইনে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে সমস্যা হবার কথা নয়। তবে, একটি বিষয় সকলকে ভাবতে হবে কারণ বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষার খাতা দু’জন পরীক্ষক মূল্যায়ন করেন। ফলে, শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পরীক্ষা দিলে পরীক্ষার খাতাগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে?

ক্যামেরা বাধ্যতামূলকভাবে চালু রেখে অনলাইন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। পরীক্ষার শেষে উত্তরপত্রের ছবি তুলে অথবা স্ক্যান কপি পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষকের নিকট জমা দেওয়ার বিধান করা যেতে পারে। বিকল্পভাবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি কেন্দ্রীয় ড্রপবক্স তৈরি করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করতে পারে যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উত্তরপত্র আপলোড করবে এবং পরীক্ষকগণ সেগুলো মূল্যায়নের অ্যাক্সেস দেওয়া হবে। অনেকেই হয়ত আমার প্রস্তাবের সাথে একমত পোষণ করবেন না এই ভেবে যে শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময় অসৎ উপায় অবলম্বন করতে পারে। তবে, মহামারিকালীন পরিস্থিতিতে আমাদের শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস করতে হবে এবং পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শিক্ষকগন ক্যামেরার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখবেন। এমনকি, অনেকের যুক্তি দেখাতে পারেন যে যাদের ডিভাইস এবং দ্রুত গতির ইন্টারনেট সংযোগ নেই তাদের কী হবে? শিক্ষার্থীদের জন্য ডিভাইসের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অনুধাবন করে ইউজিসি ইতিমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিভাইস কেনার ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করে হলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন বাঁচিয়ে তাদের ট্রমা থেকে বের হয়ে আসতে সহায়তা করা সম্ভব।

আমরা সকলেই জানি যে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। অতএব, যে কেউ যুক্তি দেখাতে পারে যে এক বা দুই বছর পরে ডিগ্রি অর্জন করলে শিক্ষার্থীদের জীবনে খুব বেশি সমস্যা হবে না। তবে আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে আমরা কখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসব তা এই মুহূর্তে অনুমান করা সম্ভব নয়। সুতরাং, কোভিড-১৯ সৃষ্ট ‘‘নিউ নর্মাল’ জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য আমাদের অবশ্যই কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এই মহামারি চলাকালীন সময়ে সরকার বিপদে পড়া মানুষদের বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা করে চলেছে। সুতরাং, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া উচিত। আমরা সকলেই জানি যে আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়সহ অন্যান্য কর্মকর্তা, ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে সাথে নিয়ে নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন কিভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তার কৌশল নির্ধারণের জন্য। তবে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিষয়টিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।

বস্তুতপক্ষে, করোনা মহামারি আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের, যা বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য, সুফল ভোগ করার একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সরকার বিভিন্ন সেক্টরে ডিজিটাল সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্দান্ত অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে প্রচলিত শিক্ষার পদ্ধতিকে অনলাইন পদ্ধতিতে রূপান্তর করার জন্য সক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে যদি এই রূপান্তরের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোভিড-১৯ সৃষ্ট ট্রমা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।

ড. প্রণব কুমার পান্ডে: প্রফেসর, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।