গবেষণায় উদ্ভাসিত বন্দে আলী মিয়া



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
বন্দে আলী মিয়া ও গবেষণা গ্রন্থ

বন্দে আলী মিয়া ও গবেষণা গ্রন্থ

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বন্দে আলী মিয়া (১৫ ডিসেম্বর ১৯০৬-১৭ জুন ১৯৭৯)। এই স্বনামধন্য কবি, ঔপন্যাসিক, শিশু সাহিত্যিক, চিত্রকর ও সাংবাদিকের কলমে ঋদ্ধ হয়েছে সাহিত্যের নানা শাখা। তার রচিত ‘আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর/থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর’ কবিতাটি এখনো সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।

পাবনার রাধানগরের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিলেও বন্দে আলী মিয়া কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও মেধার কারণে নিজের সৃজনশীল প্রতিভাকে বিকশিত করেছিলেন অবিভক্ত বঙ্গদেশে। কলকাতা থেকে চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তিনি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও শেষ পর্যন্ত বেতার সাংবাদিকতার পেশাজীবন বেছে নেন তিনি।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ-বাংলার বিরূপ পরিবেশে বন্দে আলী মিয়া তার স্বতন্ত্র লেখনশৈলীর দ্বারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তার রচিত পালা গান ও নাটিকা নিয়মিত বেতারে প্রচারিত হতো। রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য বলয়ের প্রবল প্রতাপের মধ্যেও তিনি নিজের পরিচিত ও সাহিত্যিক খ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হন। খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্দে আলী মিয়ার রচনার প্রশংসা করেছেন।

অভিভূত রবীন্দ্রনাথ ২৬ জুলাই ১৯৩২ সালে এক চিঠিতে জানান: "তোমার 'ময়নামতীর চর' কাব্যখানিতে পদ্মাচরের দৃশ্য এবং তার প্রত্যক্ষ ছবি দেখা গেল, পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি। তোমার রচনা সহজ এবং স্পষ্ট, কোথাও কোনো ফাঁকি নেই। সমস্ত মনের অনুরাগ দিয়ে তুমি দেখেছ এবং কলমের অনায়াস ভঙ্গিতে লিখেছো। তোমার সুপরিচিত প্রাদেশিক শব্দগুলো যথাস্থানে ব্যবহার করতে তুমি কুণ্ঠিত হওনি, তাতে করে কবিতাগুলি আরও সরস হয়ে উঠেছে। পদ্মাতীরের পাড়া গাঁয়ের এমন নিকট স্পর্শ বাংলা ভাষায় আর কোনো কবিতায় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। বাংলা সাহিত্যে তুমি আপন বিশেষ স্থানটি অধিকার করতে পেরেছ বলে আমি মনে করি।”

আপন প্রতিভার ঔজ্জ্বল্যে খ্যাতিমান বন্দে আলী মিয়া কবিতার পাশাপাশি ছড়া, ছোটগল্প, নাটক, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য প্রভৃতি প্রায় দুই শতাধিক রচনাকর্মের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। বন্দে আলী মিয়ার কবিসত্তার সার্বিক মূল্যায়নে রচিত গ্রন্থ 'কবি ও কাব্যরূপ' প্রকাশ করেছে 'স্টুডেন্ট ওয়েজ'। প্রকাশনার ৭০তম বছরের ঐতিহ্যে 'স্টুডেন্ট ওয়েজ' গবেষণার নিরিখে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের আলোয় বৃহত্তম পাঠক সমাজের সামনে বাংলা সাহিত্যের এই বহুমাত্রিক লেখকে উদ্ভাসিত করেছে।

গ্রন্থটি রচনা করেছেন ঋদ্ধিমান গবেষক এম আবদুল আলীম। বন্দে আলী মিয়ার কবিপ্রতিভার স্বরূপ এবং তার কবিতার বিষয় ও শিল্পরীতি অন্বেষণে বইটি বিশেষভাবে সহায়ক।

আধুনিক বাংলা কবিতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গবেষণায় সিদ্ধহস্ত লেখকের কুশলী প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব বন্দে আলী মিয়ার জীবন ও কবিতার শৈল্পিক জগৎ উন্মোচিত হয়েছে।

লেখক এম আবদুল আলীম পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন। তার রচিত  উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ‘ত্রিশোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ’, ‘বাংলা কাব্যের স্বরূপ ও সিদ্ধি-অন্বেষা’, ‘রবীন্দ্রনাথ উত্তর-আধুনিকতা ও বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন’, ‘সবুজপত্র ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য’, ‘বাংলা বানান ও উচ্চারণবিধি’, ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’, ‘পাবনায় ভাষা-আন্দোলন’, ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা-আন্দোলন’, ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ অন্যতম।

'কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ (২০১৪) প্রাপ্ত এম আবদুল আলীমের বীক্ষণে সম্ভবত প্রথমবারের মতো গবেষণা কাঠামোর বিস্তৃত পরিসরে উপস্থাপিত হলেন বন্দে আলী মিয়া। জন্মের ১১৪ বছর পর মূল্যায়নের আলোয় সিক্ত হলেন বাংলা ভাষার অগ্রণী লেখক-কবি বন্দে আলী মিয়া। এজন্য গবেষক ও প্রকাশক ধন্যবাদের প্রাপ্য।